
করোনা এনেছে নতুন পরিস্থিতি, যাকে বলা হচ্ছে ‘নিউ নরমাল’। এর মধ্যেও করপোরেটে কাজ থেমে নেই। পণ্য উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ—চলছে সবই। কয়েকটি করপোরেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা (সিইও) কীভাবে এই পরিস্থিতিতে কাজ করছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কাজে কতটুকু ব্যাঘাত ঘটছে, মানসিক চাপ কতটুকু বেড়েছে, তা জানতে পড়ুন এই লেখা।
আগের মতোই অফিসের বৈঠক হচ্ছে, তবে সেটা ভার্চ্যুয়ালি। আগের মতোই নথি অনুমোদন পাচ্ছে, তবে সেটা অনলাইনে। আগের মতোই নির্দেশনা যাচ্ছে, তবে সেটা ই-মেইলে।
স্বাভাবিক সময়ে যেখানে এক দিন ছুটি নিয়ে বাসায় থাকার সুযোগ ছিল না, সেখানে এখন মাসজুড়ে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। মনে হতে পারে, আহ্, কী সুখ! কিন্তু বাস্তবতা আসলে ভিন্ন। সিইওরা বলছেন, শরীরীভাবে বাসায় থাকা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে কাজের চাপ ও মানসিক পীড়া বেড়েছে।
কেন ও কীভাবে, সে কথায় পরে আসছি। আগে দেখে নিই স্বাভাবিক সময়ে করপোরেটের একজন সিইও অথবা সমপর্যায়ের কর্মকর্তার দিনলিপি গড়পড়তা কেমন ছিল।
সকাল সাতটার দিকে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হওয়া। নাশতা সেরে বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিস যাত্রা। দিনভর চার-পাঁচটি সভা। সরবরাহকারী ও ক্রেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ। নথি দেখা, সই করা। ফাঁকে অফিস সহকারীরা চা-কফি দিতেন। দুপুরের খাবারও নিজের কক্ষেই চলে আসত।
বিকেলে বা সন্ধ্যায় অফিস শেষ করে ব্যায়ামাগার বা জিমনেসিয়ামে গিয়ে ঘণ্টাখানেক ব্যায়াম করে বাসায় ফেরা। দিনের বাকি সময়টুকু মা-বাবার, স্ত্রী/স্বামীর ও সন্তানের। এর ফাঁকে সিনেমা দেখা, বই পড়া অথবা পত্রিকা বা সাময়িকী পড়াও থাকত রুটিনে। কখনো কখনো সামাজিক ও করপোরেট অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হতো।
করোনা এই ‘রুটিন’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এখন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি। উঠেই ফোন অথবা ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়া। জরুরি কাজ কিছু থাকলে শেষ করে নাশতা। এরপর দিনভর শুধু ফোন, ল্যাপটপ, মেইল, জুম অথবা গুগল মিট। চলে রাত পর্যন্ত।
একান্ত জরুরি প্রয়োজনে যেদিন অফিসে যাওয়া লাগে, সেদিন বাসা থেকে খাবার নিয়ে যেতে হয়। চা-কফি নিজেকেই তৈরি করতে হয়। অফিসে বসেই সভা করতে হয় ভার্চ্যুয়ালি। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন কমে গেছে। ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে বসে কথা বলা হচ্ছে না। স্বাভাবিক সময়ের মতো কাজের নিপুণতা, গতি ও দক্ষতা নেই। অবশ্য এটা মনে রাখতে হবে যে সবার ব্যবসার ধরন যেমন এক নয়, তেমনি পরিস্থিতিও। কোনো কোনো করপোরেট পরিস্থিতি সামলে নিচ্ছে ভালোভাবেই। কেউ কেউ বলেছেন, আগের চেয়ে কাজের জবাবহিদি, সময়ানুবর্তিতা বেড়েছে।
যেমন জরুরি সেবা হিসেবে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সব সময়ের জন্য স্বাভাবিক রাখতে হয়েছে। কোনো ঘাটতির সুযোগ নেই। নতুন পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজ করছেন, তা জানালেন দেশের শীর্ষ দুই অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটার দুই সিইও।
গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান প্রথম আলোকে এক লিখিত বক্তব্যে জানান, মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই তাঁরা বাসা থেকেই কাজ করা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে নিয়মিত কথা বলি। শুধু কাজের কথা নয়, নতুন পরিস্থিতিতে তাঁদের ভালোমন্দ জানার চেষ্টা করি।’
জিপির সিইও মাসে অন্তত একবার প্রায় দুই হাজার সহকর্মীর সঙ্গে ‘ভার্চ্যুয়াল টাউন হল’ করেন। নিয়মিত বৈঠক তো রয়েছেই। তাঁর পরামর্শ হলো, সভা যাতে দীর্ঘ না হয়। কারণ, দীর্ঘ সভা কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ক্যামেরা চালু রাখা জরুরি। কারণ, মুখ দেখা দূরত্ব ঘোচাতে সহায়তা করে।
রবি আজিয়াটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাহতাব উদ্দিন আহমেদও বাসা থেকে কাজ করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সাল থেকেই কর্মীদের জন্য নমনীয় অফিস সময় ও বাসায় থেকে কাজ করার সুবিধা চালু করেছিলাম। সেটা ছিল ঢাকার যানজট পরিস্থিতির বিবেচনায়, অনেকটা পরীক্ষামূলক। কিন্তু দুই বছর পরে এসে আমরা এর সুফল পাচ্ছি।’
মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘তিন মাসে আমি একবারের জন্যও অফিসে যাইনি। সব কাজ বাসা থেকে খুব সুন্দরভাবে দ্রুত করেছি। সব মিলিয়ে আমার অভিজ্ঞতা হলো, আমাদের উৎপাদনশীলতা ও একাগ্রতা আগের চেয়ে বেড়েছে। দেশের শীর্ষ ডিজিটাল কোম্পানি হিসেবে আমাদের সব কাজও সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে করছি।’
দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। জরুরি পণ্য ও সেবা ছাড়া বাকি করপোরেটের অফিস কার্যক্রম মোটামুটি ৫ মে পর্যন্ত বন্ধই ছিল। কেউ কেউ এরপর খুলেছে, আংশিকভাবে। ৩০ মে সরকারি সাধারণ ছুটি শেষের পর সব করপোরেটের কার্যক্রমই পুরোদমে চলছে।
করপোরেটগুলো ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কর্মীকে অফিসে আসতে বলছে, বাকিদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। পালা করে অফিস করার রীতিও নিয়েছে কেউ কেউ। অফিসে ঢোকার মুখে প্রত্যেকের শরীরের তাপ পরিমাপ, জীবাণুনাশক ছিটানো অথবা হাত ধোয়া, ডেস্কে ডেস্কে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া ইত্যাদি সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েছে সবাই।
অফিসে খাওয়ার ব্যবস্থা, তথা ক্যানটিন বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া একজন আরেকজনের ডেস্কে যাওয়া নিষিদ্ধ। গেলেও দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। মাস্ক তো পরতেই হবে। এসবের পরও কেউ অসুস্থ হলে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থার করছে অফিস।
শিল্পগোষ্ঠী আনোয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানোয়ার হোসেন জানালেন, তাঁদের গ্রুপের কর্মী সংখ্যা ১২ হাজার। এখন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কর্মী অফিস করছেন। বাকিরা বাসায় থেকে কাজ করেন। তিনি জানান, বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মী এবং যাঁদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের স্বাস্থ্যগত কারণে অফিসে আসতে বারণ করা হয়েছে।
ইস্পাতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায় নিয়োজিত কেএসআরএম গ্রুপে করোনার শুরু থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাই অফিস–কারখানায় কাজ করছেন। একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে একদল স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে গ্রুপটিতে, যারা প্রতিদিন কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি দেখছে। কেএসআরএমের সিইও মেহেরুল করিম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করার বিষয়ে এখন অনেকটা অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে। তবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কাজে কিছুটা ধীরগতি তো হচ্ছেই।
করোনাকাল শুরুর পর পুরো সময় খোলা ছিল ব্যাংক, যদিও সব শাখা নয়। এখন সব শাখাই খোলা থাকছে। ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিক সময়ের মতোই। আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার জানালেন, তিনি সেটা কীভাবে করছেন। বলেন, তিনি সকাল ১০টায় অফিসের কাজে বসে যান। স্বাভাবিক সময়ের মতোই কাজ করেন। শারীরিকভাবে তিনি নিজের কক্ষে, না বাসায়, সেটা খুব জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। নথি অনুমোদন তিনি ই–মেইলে দিচ্ছেন। খুব জরুরি কিছু হলে সেটা তাঁর বাসায় যাচ্ছে। দৈনন্দিন ক্ষেত্রে এখন অনলাইনেই কাজ সারছেন। অফিসে না গেলে কি কাজ স্বাভাবিক সময়ের মতো হয়, এ প্রশ্নের জবাব একেকজনের কাছে একেক রকমের।
সুপারশপ স্বপ্নের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান বলেন, বাসায় তিনি নিজের কক্ষটিকে অফিস কক্ষে রূপান্তর করেছেন। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাস অফিসে যাওয়া এবং বাসায় থেকে কাজ করার মাধ্যমে তিনি চালিয়েছেন। নিজেদের স্টোর পরিদর্শনে প্রায়ই যেতে হয়। জুনে এসে তিনি বাসা থেকে অফিস করছেন। আর মাঝেমধ্যে স্টোর পরিদর্শনে যাওয়া অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
সাব্বির হাসান বলেন, ‘আমার মনে হয়, বাসায় থেকে কাজ করে উৎপাদনশীলতা ও জবাবদিহি বেড়েছে। অযথা সময় নষ্ট হয় না। আর যেহেতু অফিসে যাওয়া, পথে সময় নষ্ট হচ্ছে না, পড়াশোনার বাড়তি সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিপ্লব কুমার রায় বললেন, ‘আমরা একটা নতুন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সবাই তা বোঝে। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করছি।’
ফ্যাশন ব্র্যান্ড আড়ংয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. আশরাফুল আলম বললেন, ‘অফিসে না গেলে কাজ হবে না, আমাদের সে ধারণায় বদল এসেছে। করোনাকাল একটি নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট অফিস সময় বলতে কিছু থাকছে না।’
করোনাকালের দিনলিপিতে এখন মূল কাজ ফোন ধরা। মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে মাথা ঝিম ধরে যায়। ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে সভা করতে করতে কান ব্যথা হয়ে যায়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অবসর বলতে কিছু নেই। নিজের সময়, পরিবারের সময় বলতে কিছু নেই। ঘরে থাকতে থাকতে পরিবারের সদস্যরা, বাচ্চারা বিরক্ত। একজন সিইও বলেন, এভাবে আর হয় না। এখন মনে হচ্ছে, অফিসে যেতে পারলেই বাঁচা যেত।
অবশ্য এ বিষয়ে স্বপ্নের সাব্বির হাসানের একটি পরামর্শ আছে। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে একটু বিরতি দিতে হবে। সবুজের দিকে, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ‘জুম ফ্যাটিগ’ দূর করতে হবে।

নিউজ ডেস্ক 















